মন ছুঁয়ে যাওয়া মর্মন্তুদ কাহিনি
- ড. এম এ মাননান
https://goo.gl/Rkq5T1
সাল ১৯৭১। সময়টা ডিসেম্বরের মাঝামাঝি। গ্রামে রাজাকারদের ভীতিজনক উত্পাত দেখে রঙচটা লুঙ্গি আর হাফ শার্ট পরে কুমিল্লা থেকে যাত্রা করে ঢাকায় এক আত্মীয়ের বাড়িতে পৌঁছলাম রাত প্রায় একটার দিকে। হানাদার বাহিনীর প্রিয় জিনিস ‘ডান্ডি কার্ড’ সঙ্গে না থাকলে রাস্তাতেই হতো আমার জীবনের যবনিকাপাত। লঞ্চ থেকে বাদামতলীর কাছাকাছি বুড়িগঙ্গার পাড়ে নামতেই ধরা পড়লাম পাকসেনাদের হাতে। ‘ডান্ডি দেখাও’ বলার সঙ্গে সঙ্গে পানের দোকানের কর্মচারীর নামে তৈরি করা কার্ডটা দেখালাম। কনুই আর হাঁটু পরখ করে ‘ডান্ডি কার্ড’ দেখে হাই পাওয়ারের চশমা পরা ছেলেটিকে তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে ছেড়ে দিলো। মেইন রোড ছেড়ে অলিগলি দিয়ে আতঙ্কিত মনে তাঁতীবাজারে এক আত্মীয়ের বাসায় উঠলাম। পরেরদিন জগন্নাথ কলেজে পড়ুয়া এক আত্মীয়কে নিয়ে নয়াবাজারের দিকে গিয়ে স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। গুটিকতক মানুষের সতর্ক আনাগোনা, রক্তাক্ত পিচঢালা পথ,
আগুনে পোড়া সব দোকানপাট আর পচা ক্ষত-বিক্ষত লাশের দুর্গন্ধে ভারী পুরনো ঢাকার বাতাস। সঙ্গীকে নিয়ে বংশালের ভিতর দিয়ে কুখ্যাত খোন্দকার মোশতাক আহমেদের বাড়ির সামনে দিয়ে ঘুরে বদরুন্নেছা কলেজের পাশ দিয়ে বুয়েটের সামনের রাস্তা হয়ে পলাশী মোড়ে এসে পরিচিত দোকানদারদের সঙ্গে কথা বলে খোঁজ-খবর নিয়ে আমার প্রিয় মাস্টারদা সূর্যসেন হল (তখন জিন্নাহ হল)-এ আমার ১০৮ নম্বর রুমটি দেখার জন্য কিছুদূর এগোতেই দেখি পাকহানাদার বাহিনীর গুম্ফধারী কয়েকজন সেনা মহসিন হলের মাঠে বসে গল্প-গুজবে মেতে আছে। আর এগুলাম না। নীলক্ষেতের পরিচিত একটি লেপের দোকানে বসলাম। কথার ফাঁকে জানলাম সে মুক্তিযুদ্ধের পুরো সময়টাই ঢাকায় আছে। অনেক খবর তার জানা। তার কাছ থেকেই জানলাম সব ছাত্রহলে পাকবাহিনী লুট করেছে আর এখন ক্যাম্প বানিয়েছে। কর্মচারীদের গুলি করে আর বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে মেরেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক ঘটনার সাক্ষী, মধুর ক্যান্টিনের স্বত্বাধিকারী জীবন্ত ইতিহাস মধুদাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। শিরদাঁড়া বেয়ে একটা অজানা ভয়ের স্রোত বয়ে গেলো যখন শুনলাম ভয়ঙ্কর সেই দিনের কথা যেদিন ঋষিতুল্য অমায়িক শান্তশিষ্ট অজাতশত্রু সমসাময়িক কালের অন্যতম সেরা দার্শনিক অধ্যাপক জি সি দেবকে অসভ্য বর্বর হানাদাররা তাদের দোসর আলবদর বাহিনীর শয়তানতুল্য জল্লাদদের সহায়তায় শিববাড়ির বাসা থেকে টেনে-হিঁচড়ে জগন্নাথ হলের মাঠে নিয়ে হলের ছাত্র-কর্মচারীদের সঙ্গে দাঁড় করিয়ে গুলি করে মাটিচাপা দিয়ে উল্লাসে ফেটে পড়েছিলো। শুনলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষককে ধরে নিয়ে গেছে অজ্ঞাত স্থানে। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে যাকেই পাচ্ছে তাকেই নির্বিচারে হত্যা করছে।
১৩ কী ১৪ ডিসেম্বর শুরু হয় ভারতীয় বিমানবাহিনীর আক্রমণ ঢাকার আকাশে। রাতেই রেডিও’র খবরে শুনলাম, ১৬ ডিসেম্বর হানাদারবাহিনী মিত্রবাহিনীর নিকট রেসকোর্স ময়দানে আত্মসমর্পণ করবে। সারারাত আমরা ঘুমাইনি। অপেক্ষা করছি পূর্ব দিগন্তে কখন স্বাধীনতার লাল সূর্যটার উদয় হবে। সকাল প্রায় ৭টার দিকে নয়াবাজার হয়ে কয়েকজন মিলে ছুটলাম রেসকোর্স ময়দানের দিকে। দেখি অগণিত লোকজনের মিছিল। আসছে তো আসছে। বাংলা একাডেমির পাশে শিববাড়ির সরু রাস্তাটায় বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচিত কয়েকজন কর্মচারীকে পেয়ে গেলাম। তাদের কাছ থেকে শুনলাম বিগত কয়েক রাতের রোমহর্ষক ঘটনা। সিনিয়র অধ্যাপকদের চোখ বেঁধে ধরে নিয়ে যাওয়া, মেডিক্যাল সেন্টারের ডাক্তার মর্তুজাকে গুলি করে হত্যা, শিববাড়ির বস্তিবাসীদের নির্বিচারে মেরে ফেলা, রেসকোর্স ময়দানের বিখ্যাত কালীমন্দিরটি গুঁড়িয়ে দেয়া, আরো আরো সব ভয়ঙ্কর ঘটনার কথা।
জেনেছিলাম, বুদ্ধিজীবী হত্যার পরিকল্পনা করা হয় ২৫ মার্চের আগেই। আর এ জঘন্য কূটকৌশল আঁটে মেজর জেনারেল ফরমান আলী যার ডায়েরি থেকে বুদ্ধিজীবীদের একটা তালিকায় সারাদেশের হাজারখানেক প্রথিতযশা ব্যক্তিবর্গের নাম পাওয়া যায়। তবে হত্যার মূল ক্ষেত্র ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ২৫ মার্চ রাত থেকে ২৭ মার্চ সকাল পর্যন্ত স্বয়ংক্রিয় আধুনিক রাইফেল, ট্যাঙ্কবিধ্বংসী বিকয়েলস্, রকেট লাঞ্চার, মর্টার আর হালকা মেশিনগান নিয়ে হানাদার বাহিনী অবস্থান নেয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। জেনেছি, প্রথম হামলা হয় নীলক্ষেত আবাসিক এলাকার ২৩ নং বাড়িতে যেখানে দুই আত্মীয়সহ মৃত্তিকা বিজ্ঞানের অধ্যাপক ড. ফজলুল রহমানকে হত্যা করা হয়। এরপর হানা দেয় অধ্যাপক আনোয়ার পাশা ও রাশিদুল হাসান স্যারের বাসায়। কিন্তু বিদ্যুিবহীন অন্ধকার ঘর থেকে ফিরে যায় হানাদার পশুরা। উভয় শিক্ষক ওই রাতে প্রাণে বেঁচে গেলেও আলবদর বাহিনী তাদের ঠিকানা খুঁজে বের করে পরে তাদের হত্যা করে। ২৪ নং বাড়ির বাসিন্দা বাংলার অধ্যাপক ও নজরুল গবেষক ড. রফিকুল ইসলামের বাসার সামনে আহত এক নারীর রক্ত দেখে হার্মাদের দল ফিরে যায়। প্রাণে বেঁচে যান স্যার। কিন্তু বাঁচতে পারেননি ফুলার রোডের বাসায় থাকা ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. মুক্তাদির। তাদের টার্গেট ছিল প্রগতিশীল, স্বাধীনচেতা, দেশপ্রেমিক শিক্ষক/বুদ্ধিজীবীদের হত্যার মাধ্যমে মেধাশূন্যতা তৈরি করে ভবিষ্যত্ বাংলাদেশকে পঙ্গু জাতির দেশে পরিণত করা।
কী অপরাধ করেছিলেন আলতাফ মাহমুদ? নিভৃত কবি মেহেরুন্নেছাকে কী অপরাধে বিহারি অধ্যুষিত মিরপুরের বাসায় গলা কেটে তারই চুল দিয়ে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিল ফ্যানের সঙ্গে? অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী, আনোয়ার পাশা, মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, ড. হাবিবুর রহমান, ড. গিয়াস উদ্দিন আহমেদ, ড. জ্যোতির্ময় গুহ ঠাকুরতা, ড. রাশিদুল হাসান, সুখরঞ্জন সরকার, মীর আবদুল কাইয়ূম, শহীদুল্লাহ কায়সার আর জহির রায়হান কী দোষ করেছিলেন? তাদের ক্ষুরধার লেখনীই কি তাদের কাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল? সাংবাদিক গোলাম মোস্তফা, খোন্দকার আবু তালেব, নিজাম উদ্দিন আহমেদ, শহীদ সাবের, সেলিনা পারভীন, শেখ আবদুল মান্নানসহ আরও অনেক প্রখ্যাত সাংবাদিক কি জনজাগরণের কথা লিখে অন্যায় করেছিলেন? রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মীর আবদুল কাইয়ূমকে কেন পদ্মার তীরে জীবন্ত কবর দেওয়া হয়েছিল? ঠাকুরগাঁওয়ের কয়েকজন বুদ্ধিজীবীকে কী কারণে জীবন্ত অবস্থায় বাঘের খাঁচায় ফেলে দেওয়া হয়েছিল? মাগুরার শিক্ষিকা লুত্ফুন্নাহার হেলেনকে কেন জীপের পেছনে বেঁধে ছেঁচড়ে ছেঁচড়ে শহরের রাস্তায় ঘুিরয়ে হত্যা করা হয়েছিল? যশোরের আইনজীবী মশিউর রহমানের চেহারা কী কারণে বীভত্সভাবে বিকৃত করে দেওয়া হয়েছিল? সৈয়দপুরের ডাক্তার শামশাদ আলীকে কোন অপরাধে ্ট্রেনের জ্বলন্ত কয়লার ইঞ্জিনে ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া হয়েছিল? মিরপুরের ‘জল্লাদখানা’ খ্যাত বধ্যভূমিতে কেন লোকদের হত্যা করা হতো? সৈয়দপুর, পার্বতীপুর, পাকশী, ঈশ্বরদী, পাহাড়তলীতে ট্রেনের ইঞ্জিন কেন সব সময় জ্বালিয়েই রাখা হতো বুদ্ধিজীবীসহ অন্যদের পোড়ানোর জন্য?
ধর্মের ধ্বজাধারী পাকিস্তানি হানাদাররা এদেশীয় বেঈমানদের সহায়তায় এমনি এমনি সারা দেশের ৯৯১ জন বুদ্ধিজীবীকে হত্যা করেনি। পরিকল্পনা ছিল সুচিন্তিত আর আয়োজন ছিল ব্যাপক। নিষ্ঠুরভাবে সারা দেশে তারা তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেছে। মোহাম্মদপুরের শারীরিক শিক্ষা কলেজকে আলবদর বাহিনীর সদর দপ্তর বানিয়ে সদ্য ফাঁসি হওয়া জামায়াতে ইসলামীর মহাসচিব বুদ্ধিজীবী নিধনের মূল হোতা আলী আহসান মো. মুজাহিদের নেতৃত্বে বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়। তাকে সক্রিয় সহায়তা করে মীর কাসেম আলী, বুদ্ধিজীবী কিলিং মিশনের ইনচার্জ চৌধুরী মঈনউদ্দিন আর চীফ এক্সিকিউটর আশরাফুজ্জামান খান। তারা এক এক করে হত্যা করেছে বুদ্ধিজীবীদের। এ লেখনী আর কতো লিখবে দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের নিধনের মর্মন্তুদ বেদনার কাহিনি! কলম তো অশ্রুজলে ভিজে যাচ্ছে। আনন্দের কথা সে লিখবে সেদিন যেদিন দেখবে বুদ্ধিজীবী হত্যার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সকল অপরাধীর বিচারের পাশাপাশি সকল শহীদ বুদ্ধিজীবীর নির্ভুল তালিকা তৈরির কাজ সম্পন্ন হয়েছে।
- ইত্তেফাক