রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার পশ্চিম সীমানা ছুঁয়ে উত্তর দিক থেকে দক্ষিণে প্রবাহমান করতোয়া নদী।করতোয়ার পশ্চিম পাড় দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ উপজেলা। পূর্ব পাড় রংপুর জেলার সীমানা।নবাবগঞ্জ থেকে আনুমানিক ১০ কিলোমিটার পূর্বে পীরগঞ্জ উপজেলা।
পীরগঞ্জ সদরের বুক চিরে চলে গেছে রংপুর-ঢাকা মহাসড়ক। মুক্তিযুদ্ধের সময় পীরগঞ্জের অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিলো।কারণ পীরগঞ্জ নিয়ন্ত্রণে নিতে পারলেই রংপুর-দিনাজপুর-ঠাকুরগাঁও ও বগুড়ায় অবস্থানরত পাকিস্তানি বাহিনীর মধ্যে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করা সম্ভব হবে।
১৯৭১ খ্রিস্টাব্দের ৬ ডিসেম্বর ভারতীয় পার্লামেন্টের বিবৃতিতে দেশটির প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়।একই দিন সন্ধ্যার আগেই হিলি অক্ষের চরকাই ও নবাবগঞ্জ এলাকায় মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় সেনাদের এক বিশাল সমাবেশ গড়ে ওঠে।
৬ ডিসেম্বরেই যৌথবাহিনী করতোয়ার কাঁচদহ ঘাট এলাকা নিয়ন্ত্রণে নেয়।এরপর ৭ ডিসেম্বর মঙ্গলবার সকালে ভারতের ৩৪০ ব্রিগেড ও মুক্তিযোদ্ধারা চরকাই-নবাবগঞ্জ এলাকা থেকে পূর্বদিকে পীরগঞ্জ অভিমুখে যাত্রা শুরু করে।বিকেল পাঁচটার দিকে তারা পীরগঞ্জ সদরে প্রবেশ করে এবং বিনা প্রতিরোধে পীরগঞ্জ সদর নিয়ন্ত্রণে নেয়।
ফলে ৭ ডিসেম্বর হানাদার মুক্ত হয় পীরগঞ্জ সদর।যৌথবাহিনী এর পর পরই ঢাকা-রংপুর মহাসড়কের লালদিঘী অংশে অবস্থান নিয়ে প্রতিরোধ বলয় সৃষ্টি করে।নির্দিষ্ট করে বললে যৌথবাহিনী মহাসড়ক থেকে ২০০ গজ পশ্চিম দিকে লালদিঘী-কিশোরগাড়ি রাস্তায় কামাল উদ্দিনের বাড়ির সামনে অবস্থান নেয়।সন্ধ্যার পর পরেই পাকিস্তানের ১৬ ডিভিশনের অধিনায়ক মেজর জেনারেল নজর হোসেন শাহ্ গাড়িবহর নিয়ে এই পথে বগুড়ায় যাচ্ছিলেন।
গাড়িবহর লালদিঘীর প্রবেশমুখেই (বর্তমানের বিসমিল্লাহ পেট্রোল পাম্পের সামনে)যৌথবাহিনীর প্রতিরোধের মুখে পড়ে।মেজর জেনারেল নজর হোসেন কোনোরকমে প্রাণে বেঁচে গেলেও যৌথবাহিনী এক পাকসেনাকে যুদ্ধের কিছু গুরুত্বপূর্ণ দলিল ও ম্যাপসহ আটক করে।
এই অ্যামবুসে পাকবাহিনীর দুটি গাড়ি ধ্বংস হয়।এই ঘটনার পর ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর, সৈয়দপুর ও রংপুরের সঙ্গে হানাদার বাহিনীর বগুড়ার সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়।
এই পরিস্থিতিতে রংপুরের দিক থেকে পাকিস্তানের ৮ পাঞ্জাব রেজিমেন্টের দুটি কোম্পানি তিনটি ট্যাঙ্ক নিয়ে লালদিঘী-পীরগঞ্জ আক্রমণে এগিয়ে আসতে থাকে।তারা সুকানচৌকি পার হয়ে আনুমানিক ২৫০ গজ দক্ষিণে মহাসড়কে (বর্তমানের বাজিতপুর আমিনিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান ফটকে) যৌথবাহিনীর প্রথম প্রতিরোধের মুখে পড়ে।সেখানে উভয়পক্ষের মধ্যে তুমুল যুদ্ধ হয়।উভয়পক্ষের অনেক সেনা নিহত হয়।
যৌথবাহিনীর শহীদ সেনাদের লালদিঘীর পুকুরপাড়ে সমাহিত করা হয়।একই সময়ে বগুড়ার দিক থেকে পাকিস্তানের ৩২ বালুচ রেজিমেন্টের অধিনায়ক লে.কর্নেল সুলতান মাহমুদ দুটি কোম্পানি সেনা নিয়ে লালদিঘীর দিকে আসতে থাকে।
তাদের ধারণা ছিলো, তারা লালদিঘীতে এসে যৌথবাহিনীর ওপর আক্রমণ চালাতে পারবে।কিন্তু এই সময়ের মধ্যে যৌথবাহিনী পীরগঞ্জ থেকে বিপুল শক্তি নিয়ে এগিয়ে পীরগঞ্জ-পলাশবাড়ি সীমানার তেলামু(বর্তমানে বি টি সি) নামক স্থানে অ্যাম্বুস করে।বগুড়ার দিক থেকে এগিয়ে আসা পাকবাহিনী সেখানে যৌথবাহিনীর প্রতিরোধের মুখে পড়ে এবং ৮ ডিসেম্বর ভোর পর্যন্ত তুমুল যুদ্ধ হয়।
এই যুদ্ধে প্রচন্ডরকমের বাঙালিবিদ্বেষী পাক কর্মকর্তা লে. কর্নেল সুলতান মাহমুদসহ অনেক পাকসেনা নিহত হয়।এই ঘটনার পর দিশেহারা পাকবাহিনী পলাশবাড়ির সড়ক জনপথ বিভাগের (সি এন্ড বি) কার্যালয়ে গড়ে তোলা ক্যাম্প ও নির্যাতন কেন্দ্র থেকে পালিয়ে যায়।এই যুদ্ধের মধ্য দিয়েই ৮ ডিসেম্বর পলাশবাড়ি হানাদার মুক্ত হয়।
৭ ডিসেম্বর পীরগঞ্জ সদর হানাদার মুক্ত হলেও উপজেলার বিভিন্ন স্থানে বিচ্ছিন্নভাবে পাকবাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধ চলতে থাকে।
১৪ ডিসেম্বর বড়দরগাহ্ মুক্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে পুরো পীরগঞ্জ উপজেলা স্বাধীন হয়।
৭ ডিসেম্বর কাঁচদহ ঘাট পারাপারকালে করতোয়া নদীতে আটকে পড়া যৌথবাহিনীর ব্যবহৃত সমরাস্ত্র। নদী খননকালে উদ্ধারের পর বর্তমানে রংপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে সংরক্ষিত।
তথ্য সূত্র: কাজী লুমুম্বা লুমু

0 Comments