লেখক: সিরাজুল ইসলাম
১লা বৈশাখে আমার পৃথিবীর আলোয় আগমনী দিবস ।
জানিনা সেদিনের পৃথিবী কেমন ছিল ?
স্বাধীনতা যুদ্ধের কিছু আগে জন্ম নিলেও যুদ্ধকাল নিয়ে তেমন কোন স্মৃতি আমার মনে নেই।
বুঝতে শেখার পর থেকে আজ পর্যন্ত এই ছোট্ট জনমে জীবনের যত কিছুর পরিবর্তন দেখেছি,বোধকরি আমার পূর্বের মানুষ একজনমে এত কিছু দেখতে পারেনি এবং পরের প্রজন্ম এত পরিবর্তন দেখতে পারবে বলে মনে হয় না।
আমি গ্রামের মানুষ। গ্রামের মানুষ বায়স্কোপে গণি মিয়ার বাড়ী, সিনেমার নায়ক-নায়িকা বা ভিলেনের ছবি,ঢাকার আহসান মঞ্জিল এবং বঙ্গভবনের স্থির ছবি দেখে আধুনিকতার ছোয়া উপভোগ করত।
His Master Voice এর কলের গান,রেডিও এরপর
সাদা-কালো টেলিভিশন ব্যাটারি দিয়ে চালানোর জামানা। বাঁশের মাথায় লাগানো এন্টিনা ঘোরানোর বিশাল কর্মযজ্ঞের পরে নিদিষ্ট সময়ে বিটিভি দেখা যেত।
কোন কারনে এন্টিনা ঘুরে গেলে ঝিরঝির পর্দা আর সজোরে শো শো শব্দ।
গ্রামের মানুষ প্রয়োজনে শহরে গেলে হয়তো কেউ কেউ সিনেমা দেখতো এবং শহর থেকে ফেরার পথে সামান্য সেফফল,কমলা, আঙ্গুর বা পাউরুটি কিনে ফিরতো।
বাসে কিংবা বাসষ্টেসনে ফেরিওয়ালার লেবুনচুস খুবই জনপ্রিয় ছিল।
কারন বাস যাত্রীদের অর্ধেকই বমিতে অভ্যস্ত ছিল।
সন্ধ্যা নামলেই গ্রাম অন্ধকারে ডুবে যেত, কেরোসিনের নিবু নিবু বাতি যেমন হ্যারিকেন,ন্যম্পো জ্বালিয়ে রাতের খাবার খেয়েই ঘুম। যারা পড়াশুনা করতো তারাও কেরোসিনর অভাবে বেশী রাত জেগে পড়াশুনা করতো না।
এলো বিদ্যুৎ , রঙ্গিন টেলিভিশন,সাদাকালো থেকে রঙ্গিন সিনেমা, যত্রতত্র সিনেমা হলে দেখা শুরু সিনেমা।
এই সব সিনেমা হল অনেক আগেই বিলুপ্তির পথ ধরেছে।
দলবেধে রেডিওতে অনুরোধের গান শোনা, ভিসিআর, ভিসিপিতে সিনেমা দেখা এবং ক্যাসেট প্লেয়ারের গান শোনার রমরমা যুগেরও অবসান হয়েছে।
স্যাটেলাইট চ্যানেল ,ডিশ, ফেসবুক এবং ইউটিউবের দখলে গ্রাম থেকে শহর, শহর থেকে মহানগর।
এখন ইন্টারনেট যুক্ত বিশ্বময়।
এসব আমরা কখনো কল্পনাই করিনি।
রোগব্যধি,অভাব-অনটন ছিল গ্রামের মানুষের নিত্যদিনের সাথী।বসন্ত,কুষ্ঠ্য, ম্যালেরিয়া এবং যক্ষ্মাকে সকলেই ভয় পেত এবং প্রায় সকলেই এই সব রোগীদের এড়িয়ে চলতো। প্রচলিত ছিল,যক্ষ্মা হলে রক্ষা নাই।
চুলকানি,দাউদ, খোসপাচড়াসহ মানুষের শরীরে পোকাও দেখেছি।তাদের অসহ্য যন্ত্রনা দেখে চোখের জলও ফেলেছি।
তখন এত চিকিৎসকও ছিল না এবং চিকিৎসা করানোর সামর্থ্যও ছিল না।কেউ অসুস্থ হলে কবিরাজের চিকিৎসা নিতো, সাগু কিংবা বার্লি খেতো এবং পরিবারের অন্য সদস্যেরা চোখের জল ফেলতো।
এখন সামান্য সর্দি-জ্বরেই অনেকেই নামকরা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের শরনাপন্ন হয়।
তেল-সাবানের প্রচলন ছিল, তবে কম।কলার গাছের খাঁর দিয়ে কাপড়, শরীর পরিস্কার করতো।
মহিলাদের মাথায় উকুনের রামরাজত্ব ছিল । মহিলারা দুপুরের পরে দল বেধে একে অপরের মাথার উকুন তুলতো।
এখন হরেক রকম সাবান, শ্যাম্পু ,তেল , লোশন এবং পারফিউম ব্যবহার হচ্ছে।
গ্রামের ছেলে মেয়েরা বিকেলে দলবেধে বিভিন্ন খেলা খেলতো।
এখনকার ছেলে মেয়েরা মোবাইল,ট্যাব, ল্যাপটপ ও কম্পিউটারে গেম খেলে বা ইন্টারনেট ব্যবহার করে বন্ধু কিংবা আত্মীয় স্বজনের সাথে চ্যাটিং করে।
গ্রামের মানুষ ক্ষুধা নিবারনের জন্য ওল,কচু,মিষ্টি আলু সিদ্ধ করে খেত।অনেকেই একটানা তিন/চার দিন এসব খেয়ে পার করতো।একবেলা ভাতের জন্য কাঁদতে দেখেছি।
কতজনকে ভাত চুরির অপরাধে শাস্তি পেতে দেখেছি, আবার মানুষের মায়া মমতাও দেখেছি।
কোন বাড়িতে মানুষ মারা গেলে তাদেরকে সাত-দশ দিন রান্না করতে হতোনা। প্রতিবেশীরা রান্না করে পালাক্রমে খাওয়াতো এমনকি কষ্টে থাকা অভাবী পরিবারগুলোরও একবেলা খাওয়ানোর চেষ্টা দেখেছি।
আগে যে সামান্য আবাদ করা হতো , সার কিটনাশকের ব্যবহার না করায় ফলন অত্যন্ত কম ছিল।
সেচ দিয়ে ইরি-বোরো ধানের আবাদ দিয়েই গ্রামীন জীবনধারা পাল্টানো শুরু। এখন হাজারো রকমের শস্য,শাকসবজি,ফলমুলের আবাদ হচ্ছে , বাম্পার ফলন হচ্ছে গ্রামে এখন অভাব নেই।
কুয়ার পানি বালতি দিয়ে জমিতে সেচের শুরু হলেও এখন বিদ্যুৎ চালিত অগভীর এবং গভীর নলকুপের সাহায্য সেচের কাজ চলছে।
যে জমিতে ৬/৭ মন ধান উৎপাদন হতো এখন হয় ত্রিশ/পয়ত্রিশ মন ,আলু ৭/৮ মন থেকে ৪০/৪৫ মন।
এই রেকর্ড পরিমান ফলন বৃদ্ধি কেউ কল্পনা করেছিল কি ?
গ্রামীণ জীবনধারার চোখ ধাঁধানো পরিবর্তন কেউ ভেবেছিল কি ?
গ্রামের বিয়ে গুলোতে গরুর গাড়ীর ব্যবহার হত,হ্যাচাগের আলোই ছিল আলোকসজ্জা,গানবাজনার জন্য মাইক,এরপর রিক্সা,ভ্যান, ভটভটি থেকে মাইক্রোবাস, কার,জীপ এবং বিদ্যুতের রঙ্গীন আলোর ঝলকানি।
বিয়েতে ছবি তোলার জন্য থানা সদরের ফটো স্টুডিওর ফিল্মযুক্ত ক্যামেরা ভাড়ায় আনা হতো অথবা বিয়ের পোশাকে দল বেধে স্টুডিওতে যেতো।
একটি ফিল্মে ৩০/৩২টি ছবি তোলা যেত। আত্মীয় বা বন্ধুবান্ধবের ক্যামেরা ধার করে ফিল্ম কিনে ছবি তুলতে বিপত্তি হয় নাই এমন কেউ ছিল না।
সাজ দিয়ে ফিল্ম শেষ হওয়ার চিন্তা মাথায় নিয়ে নদীর ধারে বা মাঠের ক্ষেতের মধ্যে কষ্ট করে ছবি তোলার পর
ফিল্ম ডেভলপমেন্ট করে দেখা গেছে একটি ছবিও নাই।
ফিল্মের ব্যবহার এখনকার ছেলে মেয়েদের কাছে গল্প মনে হতে পারে।
এখন,বিয়েতে লাইভ ভিডিও প্রদর্শন হয়,উন্নত ভিডিও গানের সমন্বয়ে এডিট করা হয়।ফিল্মের ক্যামেরার পরিবর্তে ডিজিটাল ক্যামেরা,মোবাইল ক্যামেরায় হাজার হাজার বা যত খুশী ছবি তোলা যায়, ফিল্ম শেষ হওয়ার চিন্ত শেষ হয়েছে।
মানুষের মাটির ঘর থাকলেও গোসল কিংবা পায়খানার ব্যবস্থা ছিল না। পুরুষ বা বাচ্চারা দিনে ঝোপঝাড়ে প্রস্রাব পায়খানা করতে পারলেও মহিলারা রাতের জন্য অপেক্ষা করতো।
এখন প্রতি বাড়ীতে পাকা পায়খানা,গোসলখানা এবং গ্রামেও অত্যাধুনিক মডেলের বাড়ী-গাড়ী চোখে পড়ে।
বড় গাছ,বন জঙ্গল , প্রচুর ফলের গাছ, ফলও ছিল।
কিন্তু এখনকার মত সুস্বাদু ফল তখন পাওয়া যেত না।
যে কোন ঈদে, ঈদগাহ মাঠে নুতন জামাকাপড় তেমন চোখে পড়তো না।এখন সকলের পরনে নতুন নতুন বাহারি ডিজাইনের জামাকাপড়।
গমের আটা দিয়ে হাতে বা বাড়ীতে মেশিনে তৈরী সেমাই ঈদে খাওয়া হতো। এজন্য এটার নাম ছিল সেমাই খাওয়া ঈদ।
জামাই বা আত্মীয়র জন্য কিছু পরিবার শহর-বন্দর থেকে লাচ্ছা কিনে আনতো।
লাচ্ছা এখন যেমন সারাবছর সব দোকানে পাওয়া যায় তখন শহরেও সবসময় দেখা মিলতো না।এখন সারাবছর গ্রামের দোকানে শুধু লাচ্ছা নয় আধুনিক সকল উপকরন পাওয়া যায়।
সপ্তাহে দুই দিন হাটবার ছিল, সকলেই এইসব হাটে প্রয়োজনীয় জিনিষপত্র ক্রয়-বিক্রয় করতো।
এখন গ্রামের প্রত্যেক পাড়ায় পাড়ায় দোকান আছে, প্রায় সবকিছুই এইসব দোকানে পাওয়া যায়।
কোরবানীর ঈদ হল বকরা ঈদ।
সাত পরিবার একসাথে একটা গরু কোরবানী করতো তাই কোরবানীর সংখ্যাও অনেক কম ছিল।
ধানের খড়,পাট খড়ি, গাছের ডালপালা বা কাঠের খড়ির রান্না, এখন গ্যাসের চুলা বা রাইস কুকার বা কেরোসিনের চুলায় বন্দি।
গ্রামের যে রাস্তায় একটু বৃষ্টি পড়লেও হাটু পর্যন্ত কাদা হতো ফলে পায়ে হাঁটাও কষ্টকর ছিল সেই রাস্তা পাকা হয়েছে এবং সেখানে চলে ইঞ্জিন চালিত রিক্সা,ভ্যান এবং জীপ বা কার ।
যে রাস্তা বর্ষায় পানিতে ডুবে থাকতো এবং আমরা দলবেধে মাছ ধরতাম সে সব রাস্তা উঁচু হয়েছে। সে বর্ষাও নেই আর মাছও নেই।বাড়ীর উঠানে মাছ ধরার স্মৃতির কথা বললে এ যুগের বাচ্চারা গোপালভাড়ের গল্প মনে করে হাসবে।
কি অবিশ্বাস্য পরিবর্তন , ভাবতেই অবাক লাগে।
ঢেকি ,লাংগল জোয়াল , গরু-ছাগল এবং গরুর গাড়ী ছিল অভিজাত্যের প্রতীক।
ঢেকিতে শব্দ হলেই দলবেধে মহিলারা সেখানে গিয়ে গীত গেয়ে ধান বানত,আটা বানাত,ডাল পিষত,মসলা-মরিচ পিষত।
ঢেকিতে আটা তৈরী বা মাষ কালাই পিষলে বুঝা যেত হয় পিঠা হবে, নয় বড়া হবে।
নানা রকম পিঠা তৈরী হতো বিভিন্ন উৎসবে কিংবা আত্মীয় বা জামাইরা বেড়াতে আসলে। শীত কালে তেল পিঠা, ভাপা পিঠা,পাল্টা পিঠা,চিতই পিঠা, সিদ্ধ পিঠা এবং কুকুর ঢ্যালা তৈরী হতো প্রায় সব বাড়ীতেই।
পিঠা বিতরন হত বিভিন্ন বাড়ীতে। যেসব বাড়ীতে অতিথি থাকতো সেসব বাড়ীতে সবার আগে পিঠা যেত। কোন বাড়ীতে জামাই বেড়াতে আসলে তাহলেতো আর কথাই নেই। জামাই কোন বাড়ীর নয়, জামাই গোটা গ্রামের সকল পরিবারের।
কিন্তু আধুনিকতার চরম উৎকর্ষে আমরা আত্মকেন্দ্রিক হয়ে গেছি ,আত্মীয় বা জামাইরা পরিবার কেন্দ্রিক হয়ে গেছে।ফলে জামাইরা যেমন কদর হারাল,গ্রাম হারাল তার ঐতিহ্য।
গ্রামে স্কুল ও ছাত্রছাত্রী কম ছিল।দুর হতে শিক্ষকরা আসতেন স্কুলে ক্লাস নিতেন কিন্তু ছাত্রছাত্রীরা ইংরেজী,বিজ্ঞান ও গণিতের সমস্যা সমাধানে দুরদুরান্তে ছুটত শিক্ষিত মানুষ বা ভাল শিক্ষকের নিকট।
পেটে-ভাতে প্রায় বাড়ীতেই লজিং মাষ্টার ছিল।
শিক্ষকের পিটুনি ছিল মামুলি বিষয় ।
স্কুল জীবনে বিভিন্ন শ্রেণীতে চিঠি লেখা শিখেছি
টাকা চাহিয়া পিতার নিকট চিঠি,গ্রীষ্ম কিংবা শীতের ছুটিতে বন্ধুর বাড়ী কিংবা কোথাও বেড়াতে যাওয়ার চিঠি ইত্যাদি।
টাকা চাহিয়া পিতার নিকট চিঠি আমরা সকলেই লিখেছি এবং এই চিঠি লেখা শেখাটা দারুন কাজে দিয়েছিল।
এ যুগে এটা নিতান্তই অপ্রয়োজনীয় বিষয়।
ডাকঘর চেয়ে আবেদন লেখা শিখেছিলাম এবং ডাকঘরের জন্য আন্দোলনও করেছি।কারণ ঐ সময় ডাকঘরের খুবই প্রয়োজন ছিল।
এখনকার প্রজন্ম ডাকঘর কি সেটাই হয়তো জানে না।
ডাকঘর মারফত পিতার নিকট টাকা চাহিয়া চিঠি লিখতাম, বাবা-মা বা অভিভাবকরাও ডাকঘর মারফত মানি অর্ডার করতেন,চিঠি পাঠাতেন।গ্রাম কিংবা শহরের সকলেই ডাক পিয়নের জন্য অপেক্ষা করতো, কেউ তার সন্তান বা আত্মীয় স্বজনের খবরের জন্য ,মনি অর্ডার বা চিঠির জন্য।
কোন সন্তান গ্রাম থেকে শহরে রওনা হলে অশ্রুভিজিয়ে মা,বাবা,ভাইবোন, পাড়া প্রতিবেশী বিদায় জানাতো এবং গন্তব্যে পৌঁছেই যেন চিঠি পাঠায় সেই আকুতি জানাতো।যতদুর চোখ যায়, সকলে বাড়ীর বাহিরে দাড়িয়ে থেকে সৌভাগ্যবান সন্তানটির প্রস্থান চেয়ে চেয়ে দেখতো।
পাড়া প্রতিবেশীরা এক এক করে চলে গেলেও বাবা-মা ভাইবোন বাড়ীর ভিতরে গিয়ে নীরবে চোখের জল ফেলতো।
কারন বাবা মা জানেনা তাদের দুঃখ কষ্টের সংসারের সন্তানটা ভালভাবে ঠিক সময়ে পৌঁছাতে পারবে কি না ?
রাস্তায় কোন দূর্ঘটনা হলে কি হবে ?
যাত্রাপথে ঠিকভাবে যানবাহন পাবে কি না ?
তখন এতো গাড়ী ছিল না।
এসব চিন্তা তাঁদের উদ্বিগ্ন করে রাখতো।
সন্তানটি শহরে কিংবা গন্তব্যে পৌঁছে বাবা-মার কাছে চিঠি লিখতো। সন্তানটি গন্তব্যে পৌঁছানোর দশ/বারো দিন পর বাবা-মা জানতো তাদের সন্তান ঠিকভাবে পৌঁছাতে পেরেছে।চিঠি হাতে পাওয়ামাত্রই পরিবারে আনন্দের বন্যা বয়ে যেত এবং বাবা-মার চোখ দিয়ে আনন্দধারা বইতো।
কিন্তু এই দশ/বারো দিন সন্তান কেমন থাকল বা কোন সমস্যায় পড়ল কি না সে বিষয়ে কেউ মাথা ঘামাতো না।
এখন সকলের হাতে মোবাইল ফোন, স্মার্ট ফোন,ইমেইল, ইন্টারনে, ফেসবুকসহ বিভিন্ন এ্যাপস। ফলে সারাবিশ্ব সবসময় হাতের মুঠোয়।
এখন কেউ বাড়ী থেকে বের হয়ে গাড়িতে উঠেই ফোন, গাড়ি থামলে ফোন, টয়লেট থেকেও ফোন। শুধু ফোন আর ফোন হটাত ফোনটা বন্ধ পাওয়া গেলেই দুঃচিন্তার শেষ নেই।
জরুরী বিষয়ে টেলিগ্রাম পাঠানো হতো এবং শহরের অভিজাত পরিবারে, অফিস-আদালতে বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে টেলিফোন ছিল। থানা সদরে তাঁর যুক্ত টেলিফোন এক্সচেঞ্জ অফিসে গিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা অপেক্ষা করে লাইন পাওয়া গেলেও শো শো শব্দে অর্ধেক কথা বুঝে নিতে হতো এবং কথা শেষ না হতেই লাইন কেটে যেত।
কোন টেলিগ্রামে যদি লেখা থাকতো Come sharp your mother is serious তাহলে মোটামুটিভাবে ধারনা করা হতো মা আর ইহজগতে নেই।
যোগাযোগ ব্যবস্থার কারনে সন্তান তার মমতাময়ী মৃত মায়ের শেষ মুখ দর্শন করতে পারতো না।
সংবাদ আদান-প্রদান বা জরুরী টাকার প্রয়োজন মিটতেও দুই সপ্তাহ লাগতো।
এযুগে এটা কল্পনাও করা যায় না।
এখন মুহূর্তেই অজপাড়া গ্রাম থেকেও সারাবিশ্বে যোগাযোগ করা যায়।অল্প সময়ে দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যাওয়া যায়।
চিঠি লেখা বা মানি অর্ডারের প্রচলন নেই, মুহূর্তেই বিকাশ,নগদ ও রকেটসহ বিভিন্ন মোবাইল এ্যাপসের মাধ্যমে টাকা আদান প্রদান করা যায়।
ব্যাংকে অনলাইনে টাকা জমা ও উত্তোলন করা যায়।
ডেবিট বা ক্রেডিট কার্ড দিয়ে দিবারাত ২৪ ঘন্টা এটিএম বুথ হতে টাকা তোলা যায়। সারাদেশের গ্রাম এলাকাতেও এইসব সেবা এখন হাতের মুঠোয়।
আমরা কল্পনা করেছিলাম কি এই অবিস্মরণীয় আবিস্কার ও পরিবর্তন নিয়ে ?
আইউব খানের পাকা সড়কের জন্য গ্রামের মুরব্বীদের মুখে কত প্রশংসা শুনতাম। ৬০ ফুট চওড়া রাস্তার মাঝখানের ১০/১২ ফুট পাকা আর বাকিটা কাঁচা রাস্তা ছিল। একটা বাস বা ট্রাক চলতে পারতো। দুইদিক থেকে গাড়ী আসলে উভয় গাড়ীর একটা চাকা কাঁচায় নামাতে হতো এবং প্রায়ই গাড়ী কাদায় আটকে থাকতো।প্রতি ঘন্টায় দুই/তিনটা গাড়ীর দেখা মিলতো। প্রায় সব গাড়ী ধীর গতির লক্কর ঝক্কর মার্কা।
ধীরে ধীরে গাড়ীর সংখ্যা বাড়তে থাকলো, রাস্তা প্রশস্ত হলো এবং আধুনিক ও বিলাসবহুল গাড়ী চলতে শুরু করলো। এখন সেই রাস্তা ছয় লেন হচ্ছে কিন্তু রাস্তায় প্রতি মিনিটে ১৫-২০টি দ্রুত গতির গাড়ী চলে।
এই পরিবর্তন দেখলে জানিনা তখনকার মুরব্বীরা
কি বলতেন ? কি করতেন ?
কল্পনাতীত পরিবর্তনের মধ্যে অনেক দুঃসংবাদও
বিদ্যমান । একসময় গাজা , চোলাই মদ এবং ভাং জাতীয় নেশা করতো অত্যন্ত গোপনে ও বিশেষ দিনে। আধুনিকতার ছোয়ায় গ্রাম থেকে শহর সব জায়গায় মাদকের ভয়াল আগ্রাসন চলছে।
পিতামাতা কেঁদেছে সন্তানের সুখের জন্য এখন অনেক বাবা-মা কাঁদে সন্তানের মাদকাসক্ত থেকে মুক্তির জন্য।
অনেক পরিবর্তনের ফলে মানুষ স্বার্থপর হয়ে গেছে এবং শ্রদ্ধাবোধ কমে গেছে।
মায়ামমতা নাই বললেই চলে ,হিংসা-বিদ্বেষ হানাহানি, মারামারি এবং সমাজে বিশৃঙ্খলা বেড়েছে।
ধর্ম নিয়ে বিভক্তি বাড়ছে এবং ধর্মান্ধতা ও উগ্রতা বেড়েই চলছে।
সততা, নীতি নৈতিকতা,মানবিকতা প্রায় নির্বাসনে।
প্রতারণা,চাটুকারিতা, ঘুষ-দূর্নিতি, ঠকবজি,মিথ্যা
প্রচার প্রচারনা ভয়াবহ আঁকার ধারণ করেছে।
ধর্মীয় অনুভূতি, নির্দেশনা মুখে থাকলেও অন্তরে নেই।
আধুনিক জ্ঞানবিজ্ঞান,আবিস্কার ও উন্নতির ছোয়ায় পৃথিবীর মানুষের দাম্ভিকতা চরমে পৌঁছেছে। প্রকৃতির উপর নানাভাবে নিয়ন্ত্রন বা কাটাছেড়া চলছিল নির্বিচারে।
এজন্যই হয়তো প্রকৃতি মানুষের উপর বিরুপ হয়েছে এবং করোনার মতো অদৃশ্য ভয়াল ভাইরাসে দুই বছরের অধিক সময় ধরে সারা পৃথিবীকে অচল করে দিয়েছে। লক্ষ লক্ষ মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। চিকিৎসহীন ছিল কোটি কোটি মানুষ।
সারবিশ্বকে করোনার কাছে অসহায় আত্মসমর্পণ করতে হয়েছে।
আমার জনমে পৃথিবীর মানুষকে এত অসহায় এবং মমতাহীন দেখি নাই।
বাংলাদেশও এর বাহিরে ছিল না।
এ এক অন্যরকম বাংলাদেশ। অন্তিম শয্যায়ও আপনজনরা পাশে নেই। জানাজায় প্রিয়জনদের ঢল নেই, প্রিয় মানুষের কোলাহল নেই। বেড়ে ওঠা শৈশব, কৈশোর আর পরিণত বয়সের চিরচেনা মানুষগুলোও যেন অচেনা।
চাইলেও কাফনের কাপড় সরিয়ে প্রিয়মুখটি ছোঁয়ার কোনো সুযোগ নেই। চাইলেও প্রিয় মানুষটিকে শেষবারের মতো একপলক দেখা যায় না। এমন মৃত্যু ও শেষবিদায়ের দৃশ্য কেউ কখনও দেখেনি।
যেখানে ভয় ও শঙ্কা স্বজন হারানোর কষ্টকেও ছাপিয়ে গেছে।
অন্যদিকে করোনার সংক্রমণে নিহত লাশ দাফন করে বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন অনেক ব্যক্তি ও সংগঠন।
বিজ্ঞানের উৎকর্ষতা এবং আধুনিকতার চরম শিখরে উঠেও আমরা শুধু চোখের জল ফেলছি আর হাহাকার ও আহাজারী করছি।
পৃথিবীর যতই উন্নয়ন হোক, পৃথিবী যতই বদলাক , মানুষের হাসির চেয়ে কান্না কোন অংশেই কমে নাই।
জানিনা কবে থামবে মানুষের কান্না ?
আদৌ থামবে কি মানুষের কান্না ?
মানুষ তাঁর কান্নার মাঝেই হয়তো সুখানন্দ খুঁজে ফিরবে প্রতিটি দিন, প্রতিটি মুহূর্ত !!!



0 Comments